Search

গ্রাউন্ড-ফোর্সের জীবনবৃক্ষ :এ যেন এক সুদূর যাত্রার আবাহন


হক ফারুক আহমেদ
Writer & Senior Journalist
Dhaka, Bangladesh. 

ঠিক কোথা থেকে শুরু করা উচিত সেটাই একটা ভাবনার বিষয়। আজকাল সকল ক্ষেত্রে নেতিবাচক বিষয়-ই মানুষের অধিক প্রিয় হয়ে উঠেছে। অবস্থা এতটাই করুণ যে, কোনো কিছুকে ভালো বলে আখ্যা দিলে সবাই খোঁজার চেষ্টা করে, 'আচ্ছা কেন এটাকে ভালো বললো? কোনো সুবিধা পেয়েছে মনে হয়।' একটু পরে যে কথাটি বলবো বিশ্বাস করুন তা একবারেই দীর্ঘ উপলব্ধি থেকে উৎসারিত। শত নেতিবাচক প্রবাহে ধাবিত হওয়া অডিও শিল্পে আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে দেশের ব্যান্ড সঙ্গীতে একটা যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়েছে ব্যান্ড গ্রাউন্ড-ফোর্স। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে একাধারে একই অ্যালবামের বাংলা, ইংরেজি ও ইন্সট্রুমেন্টাল ভার্সন প্রকাশ করেছে তারা। কাজটা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক। কিন্তু অ্যালবামটা কেমন? সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই 'জীবনবৃক্ষ' একটা মাইলফলক স্থাপন করলো। এটা আগামীর বাংলাদেশী ব্যান্ডদের, বাংলা ভাষাভাষী ব্যান্ডদের নতুন করে ভাবতে শেখাবে।


ওয়েভস এর শুরু থেকে বিগ ফোর ওয়ারফেজ, রকস্ট্রাটা, ইন ঢাকা, এসেস হয়ে দেশে হেভি মেটাল মিউজিকের ইতিহাস নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধির কথাই বলে। ২০০০ পরবর্তী সময়ে ক্রিপটিক ফেইট, আর্টসেল, ব্ল্যাক, মেটাল মেইজ হয়ে পরবর্তী সময়কে এই ধারার দ্বিতীয় ঢেউ বলা যায়। ব্যক্তিগতভাবে ট্রেইনরেক বা গ্রাউন্ড-ফোর্সের উত্থানের জায়গাটিকে তৃতীয় ঢেউ হিসেবে মনে করি। যেখানে বাংলাদেশি হেভি মেটালের আন্তর্জাতিকতা শুরু বাংলাদেশে বসে গান করেই।

খেয়াল করলে দেখা যায়, এই সময়ের হেভি মিউজিকেও ধারাগত ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্মেষ ঘটেছে। যুক্ত হয়েছে সমসাময়িক সঙ্গীতের আধুনিকতা।


গ্রাউন্ড-ফোর্সের 'জীবনবৃক্ষ' নিয়ে এভাবে কেন বলছি তার একটা ব্যাখা দেয়া প্রয়োজন। ৭০' দশকের ইয়েস এর 'টেলস ফ্রম দ্য টপোগ্রাফিক ওশান', ৮০'র দশকে কুইন্সরাইকের 'ওপারেশন মাইন্ডক্রাইম', ৯০'র দশকে সাভাটেজের 'ডেড উইন্টার ডেড', বিংশ শতাব্দীতে এসে সিম্ফনি এক্স'র 'দ্য অডিসি' বা 'প্যারাডাইস লস্ট' থেকে শুরু করে ২০২১ সালে এসে কোল্ডপ্লে এর প্রকাশিতব্য 'মিউজিক ফ্রম দ্য স্ফিয়ার্স' বিশ্বের কনসেপ্ট অ্যালবামের ধারায় ধারাবাহিকতার নাম। কিন্তু আমাদের দেশে কনসেপ্ট অ্যালবামের ধারাটি প্রতিষ্ঠিত নয়। গল্পের প্লট তৈরি, সে অনুযায়ী গানের কথা ও সুর সৃষ্টি, মিউজিক্যাল এরেঞ্জমেন্ট সব মিলিয়ে জটিল ও পরিশ্রমসাধ্য একটি কাজ। তাই অনেকে সাহস করেনা।

কিন্তু গ্রাউন্ড-ফোর্স সেই দুঃসাধ্য কাজটি করেছে সুনিপুণভাবে। আর গল্পের প্লট হিসেবে 'জীবনবৃক্ষ' অ্যালবামে বেছে নিয়েছে আধুনিক সমাজের প্রযুক্তি ও তাকে ঘিরে মানুষ ও রোবটদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায়ের যুদ্ধকে। মূলত পাওয়ার ও প্রগ্রেসিভ মটাল ধারার সঙ্গীত সমৃদ্ধ হলেও বিভিন্ন ঘরাণার সঙ্গীতের সম্মিলন ঘটেছে অ্যালবামে। গানগুলোর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ক্রোধ, বেদনা, আশাহত থেকে সংকল্প, দুর্নিবার এগিয়ে চলা বা বিজয়ের স্বপ্ন। গানের কথা ও আবেগের সঙ্গে সঙ্গীতায়োজনও এগিয়ে গেছে সমান তালে। সব মিলিয়ে সেখানে একটা 'ফিলোসফিকাল স্ট্যান্ড'র ধারণা পাওয়া যায় যা মূলত মানবতাবাদী।


'জীবনবৃক্ষ' গানে পাওয়ার মেটালের চিরচেনা রুপটি বিদ্যমান। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছ চিরায়ত মেটাল ধারার কাজগুলোও। 'আজরাঈল' গানের গিটার রিফ যেকোনো শ্রোতার কানকে সেদিকে নিয়ে যাবে। 'রক্ষক' গানের কিছুটা 'ডুম' ভাব সব শ্রোতাদের ভালো না-ও লাগতে পারে। 'সত্যযোদ্ধা' ভালো কম্পোজিশন। 'সমাধি' ও 'পৃথবীর গান' তুলনামূলক সফট গান হলেও গানের কথা ও ভাবনার জায়গায় অনন্য। 'মহাপ্লাবন' গানটির শুরু ড্রিম থিয়েটারের 'স্পেস-ডাই ভেস্ট' এর কথা মনে করিয়ে দেয়। গিটারিস্ট সাজ্জাদ ও রিফাতের বেশ কিছু গিটার সলো যে কারও মাথায় খেলে যাবে ( আরে কি বাজাইলো এইটা...?)। পুরো অ্যালবামে তুর্য বলা যায় দু'হাত শুধু নয় চার হাত-পা খুলেই বাজিয়েছেন। ডাবল বেইজের দানবীয় ধরণের কিছু কাজ করেছেন তুর্য। ভোকালিস্ট জিয়া নিজেকে উতরে গিয়ে কন্ঠের পাওয়ার ও এগ্রেশনের চমৎকার খেলায় মেতেছিলেন। তবে বরাবরই বেশ কিছু জায়গায় জিয়ার কন্ঠে 'ডেভ মাস্টেইনের' প্রভাব প্রতিফলিত হয়।


সার্বিক বিবেচনায় গ্রাউন্ড ফোর্সের 'জীবনবৃক্ষ' অদ্বিতীয়। অ্যালবামের রেকর্ডিং ও সাউন্ডও আন্তর্জাতিক মানের। তবে দেশে অডিও শিল্পের সুদিন কখনো ফিরে এলে এই অ্যালবামের একটা সিডি/ডিভিডি করিয়ে রাখা জরুরি। অন্তত ডকুমেন্ট হিসেবেতো রাখা চাই। মনে রাখা দরকার, সিডি বাংলাদেশ থেকে উঠে গেছে কিন্তু বিশ্বের সকল অডিও বাজারে এখনো বিদ্যমান।

গ্রাউন্ড ফোর্সের মতো ব্যান্ড টিকে থাকাটা জরুরী। অন্তত অনাগত আরও বিশ বছরের জন্য।




38 views0 comments

Recent Posts

See All